কুন্ডলীতে চাকরি যাওয়ার যোগ: কেন এবং কখন ঘটে? জ্যোতিষীয় বিশ্লেষণ

Job loss yogas in Vedic astrology Kundli chart

বর্তমান সময়ে, বিশেষ করে করপোরেট জগতে চাকরির অনিশ্চয়তা একটি বড় চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক সময় দেখা যায়, একজন দক্ষ কর্মী দীর্ঘদিন ধরে ভালো কাজ করার পরেও হঠাৎ করে কোম্পানি তাকে ছাঁটাই করে দেয় বা বিনা নোটিশে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে একে ‘কস্ট কাটিং’ বা অফিসের রাজনীতি মনে হলেও, বৈদিক জ্যোতিষ শাস্ত্র অনুযায়ী এর পেছনে গ্রহ-নক্ষত্রের গভীর প্রভাব থাকে।

আপনার দক্ষতা বা স্কিল হঠাৎ করে কমে যায় না, কিন্তু সময় এবং গ্রহের দশা আপনার পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটায়। জ্যোতিষ শাস্ত্রের মাধ্যমে আমরা আগে থেকেই বুঝতে পারি যে কুন্ডলীতে কখন চাকরি নিয়ে সমস্যা বা ‘জব লস’ (Job Loss) হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই নিবন্ধে আমরা আলোচনা করব জন্মছকে কোন গ্রহের অবস্থান এবং কোন দশা চলাকালীন চাকরি যাওয়ার বা কর্মজীবনে বাধার সৃষ্টি হয়।

জ্যোতিষ শাস্ত্রে কর্মভাব ও চাকরি

কুন্ডলীতে দশম ভাব হলো আমাদের কর্মের স্থান। আপনি ব্যবসা করুন বা চাকরি, দশম ভাবই নির্ধারণ করে আপনার কর্মজীবন কেমন হবে। এর পাশাপাশি, লগ্ন এবং লগ্নেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ লগ্ন থেকেই আমাদের বুদ্ধি, চিন্তা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আসে।

তবে, ক্যারিয়ার কতটা উঁচুতে উঠবে তা দেখার জন্য যেমন রাজযোগ বিচার করা হয়, তেমনই চাকরি কখন চলে যেতে পারে বা সাসপেনশন হতে পারে, তা দেখার জন্য আমাদের কুন্ডলীর ‘দুঃস্থান’ বা অশুভ ভাবগুলোর দিকে নজর দিতে হয়। জ্যোতিষ শাস্ত্রে ষষ্ঠ (৬ষ্ঠ), অষ্টম (৮ম) এবং দ্বাদশ (১২শ) ভাবকে শুভ মনে করা হয় না, এবং চাকরির সমস্যার ক্ষেত্রে এই ভাবগুলোই প্রধান ভূমিকা পালন করে।

চাকরি যাওয়ার প্রধান জ্যোতিষীয় কারণসমূহ

চাকরি যাওয়ার যোগ বিচার করার জন্য একটি মূল সূত্র বা ‘প্রিন্সিপাল’ মনে রাখা প্রয়োজন। যখনই জন্মলগ্নে বা চন্দ্রলগ্নে দশম ভাব বা দশম পতির (10th Lord) সম্পর্ক ষষ্ঠ, অষ্টম বা দ্বাদশ ভাবের সাথে তৈরি হয়, তখনই কর্মজীবনে বড় ধরনের সমস্যা বা চাকরি হারানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়।

১. ষষ্ঠ, অষ্টম ও দ্বাদশ ভাবের ভূমিকা

যদিও ষষ্ঠ ভাবকে চাকরির ঘর বা ‘সার্ভিস’-এর ঘর বলা হয়, কিন্তু যখন দশম ভাবের সাথে এর অশুভ সংযোগ ঘটে, তখন এটি শত্রুতা বা কর্মক্ষেত্রে বিরোধ তৈরি করতে পারে। তবে সবচেয়ে বেশি সমস্যা সৃষ্টি করে অষ্টম এবং দ্বাদশ ভাব।

  • অষ্টম ভাব (8th House): অষ্টম ভাব হলো আকস্মিক ঘটনা, মৃত্যু বা সমাপ্তির ঘর। কর্মের ক্ষেত্রে অষ্টম ভাব সক্রিয় হলে সাসপেনশন, হঠাৎ ছাঁটাই বা কোনো ষড়যন্ত্রের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
  • দ্বাদশ ভাব (12th House): দ্বাদশ ভাব হলো ‘লয়’ বা ‘ক্ষতি’র ঘর। দশম পতি যদি দ্বাদশ ভাবের সাথে যুক্ত হয় বা দ্বাদশ পতির দশা চলে, তবে চাকরি চলে যাওয়া বা কর্মহীন হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

২. পঞ্চম ভাবের প্রভাব ও চাকরি পরিবর্তন

মজার বিষয় হলো, পঞ্চম ভাব হলো দশম ভাব থেকে অষ্টম (ভাবৎ ভাবম নিয়ম অনুযায়ী)। তাই পঞ্চম বা পঞ্চমেশ-এর দশায় অনেক সময় চাকরি পরিবর্তন হয়। যেহেতু পঞ্চম ভাব একটি ত্রিকোণ স্থান, তাই এই সময়ে চাকরি গেলে সাধারণত মানুষ দ্রুত নতুন চাকরি পেয়ে যায় বা ভালো কোনো পরিবর্তনের দিকে যায়। কিন্তু ষষ্ঠ, অষ্টম বা দ্বাদশ ভাবের দশায় চাকরি গেলে তা দীর্ঘমেয়াদী বেকারত্ব বা মানসিক কষ্টের কারণ হতে পারে।

অষ্টম ভাব ও অপযশের আশঙ্কা

শাস্ত্র মতে, অষ্টমেশ বা অষ্টম পতির দশা অনেক সময় ‘বদনাম’ বা অপযশের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অফিসের বস বা সহকর্মীরা আপনার বিরুদ্ধে চলে যেতে পারেন, অথবা আপনার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে অনেক সময় দেখা যায়, কোনো কারণ ছাড়াই বা তুচ্ছ কারণে কর্মীকে দোষী সাব্যস্ত করা হচ্ছে।

যদি আপনার কুন্ডলীতে দশম পতির সাথে অষ্টম পতির সম্পর্ক থাকে এবং সেই সময় অষ্টমেশের দশা বা অন্তর্দশা চলে, তবে আপনাকে কর্মক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে হবে। এই সময়ে অফিসের রাজনীতি বা ‘কনস্পিরেসি’ থেকে দূরে থাকা শ্রেয়।

দশা ও গোচরের ভূমিকা (Timing of Job Loss)

কুন্ডলীতে যোগ থাকলেই যে সব সময় চাকরি যাবে, তা নয়। এটি তখনই ঘটবে যখন সেই নির্দিষ্ট গ্রহের দশা বা অন্তর্দশা আসবে।

  • দশা বিচার: মূলত ষষ্ঠ, অষ্টম বা দ্বাদশ পতির দশা-অন্তর্দশায়, অথবা এই ভাবগুলোর সাথে যুক্ত দশম পতির দশায় চাকরি যাওয়ার ঘটনা ঘটে।
  • গোচর বা ট্রানজিট: দশার পাশাপাশি গোচরও গুরুত্বপূর্ণ। শনি বা বৃহস্পতির গোচর যদি অশুভ ভাবগুলোর ওপর দিয়ে হয় বা তারা যদি জন্মছকের দশম পতিকে পীড়িত করে, তবে তা ‘জব লস’-এর অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।
  • শনি সাড়েসাতি: অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, অশুভ দশার সাথে যদি শনির সাড়েসাতি বা ঢাইয়া যুক্ত হয়, তবে মানসিক চাপ ও কর্মহানির সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়।

ব্যতিক্রম: কাদের জন্য এই যোগ খারাপ নয়?

সকলের জন্য অষ্টম বা দ্বাদশ ভাবের দশা খারাপ ফল দেয় না। পেশাভেদে এর ফলাফল ভিন্ন হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ:

  • ডাক্তার বা হাসপাতাল কর্মী: দ্বাদশ ভাব হাসপাতালের কারক, তাই তাদের জন্য দ্বাদশ পতির দশা উন্নতির সময় হতে পারে।
  • গবেষক ও জ্যোতিষী: অষ্টম ভাব গোপন বিদ্যা ও গবেষণার কারক। তাই গবেষক, বিজ্ঞানী বা জ্যোতিষীদের জন্য অষ্টমেশের দশা কর্মজীবনে সাফল্য নিয়ে আসতে পারে।
  • ডেটা অ্যানালিস্ট: যারা গভীর বিশ্লেষণ বা ‘ডেটা মাইনিং’-এর কাজ করেন, তাদের জন্যও অষ্টম ভাব শুভ হতে পারে।

কিন্তু সাধারণ করপোরেট চাকরি, সেলস, মার্কেটিং বা আইটি সেক্টরের কর্মীদের জন্য এই দশাগুলো চ্যালেঞ্জিং হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

আর্থিক সুরক্ষা ও ধনের যোগ

কখনও কখনও দেখা যায়, কর্মক্ষেত্রে প্রচণ্ড চাপ বা অপমান সত্ত্বেও কারোর চাকরি যাচ্ছে না। এর কারণ হতে পারে সেই সময়ে তার একাদশ (লাভ) বা দ্বিতীয় (ধন) ভাবের দশা বা অন্তর্দশা চলছে। যদি আয়ের ভাব শক্তিশালী থাকে, তবে হাজারো সমস্যা সত্ত্বেও চাকরি টিকে থাকতে পারে, কারণ গ্রহরা নির্দেশ করছে যে আপনার আয় অব্যাহত থাকবে। হয়তো আপনাকে নোটিশ দেওয়া হবে বা ‘পিআইপি’ (PIP)-তে ফেলা হবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত চাকরিটি রক্ষা পেতে পারে।

Key Takeaways

  • দশম ভাব (কর্ম) এবং দশম পতির সাথে ৬ষ্ঠ, ৮ম বা ১২শ ভাবের সংযোগ চাকরি যাওয়ার প্রধান কারণ।
  • জন্মলগ্ন এবং চন্দ্রলগ্ন—উভয় থেকেই এই যোগ বিচার করা উচিত।
  • অষ্টম পতির দশা সাসপেনশন, ষড়যন্ত্র বা অপমানের কারণ হতে পারে।
  • পঞ্চম ভাবের দশায় চাকরি পরিবর্তন হয়, যা সাধারণত ইতিবাচক হয় (নতুন চাকরি পাওয়া যায়)।
  • শনি বা বৃহস্পতির অশুভ গোচর এবং সাড়েসাতি এই পরিস্থিতিকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
  • ধন ভাব (২য়) বা লাভ ভাবের (১১শ) দশা চললে প্রবল বাধার পরেও চাকরি টিকে থাকার সম্ভাবনা থাকে।
  • গবেষণা বা চিকিৎসা পেশার সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই নিয়মগুলো ভিন্নভাবে কাজ করতে পারে।

FAQs

১. কুন্ডলীতে কোন ভাবগুলো চাকরি যাওয়ার জন্য দায়ী?
মূলত ষষ্ঠ, অষ্টম এবং দ্বাদশ ভাব এবং এদের অধিপতি গ্রহরা চাকরি যাওয়া বা কর্মজীবনে বিরতির জন্য দায়ী। বিশেষ করে যখন এদের সাথে দশম ভাবের সম্পর্ক তৈরি হয়।

২. সাড়েসাতি চলাকালীন কি চাকরি যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে?
হ্যাঁ, সাড়েসাতি বা ঢাইয়া চলাকালীন মানসিক চাপ বাড়ে এবং কর্মক্ষেত্রে বাধা আসে। যদি এর সাথে কোনো অশুভ দশা (যেমন অষ্টমেশের দশা) চলে, তবে চাকরি যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে।

৩. পঞ্চম ভাবের দশায় কি চাকরি চলে যায়?
পঞ্চম ভাব দশম থেকে অষ্টম, তাই এটি চাকরি পরিবর্তনের নির্দেশ করে। অনেক সময় পুরনো চাকরি চলে যায়, কিন্তু যেহেতু এটি ত্রিকোণ ভাব, তাই সাধারণত ব্যক্তি দ্রুত নতুন এবং ভালো চাকরি পেয়ে যান।

৪. ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে এই যোগ কীভাবে কাজ করে?
ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে ৬ষ্ঠ, ৮ম বা ১২শ ভাবের দশা বা অন্তর্দশা আসলে ব্যবসায় লোকসান, লিটিগেশন, ইনকাম ট্যাক্স বা জিএসটি-র নোটিশ আসা বা সরকারি ঝামেলার ইঙ্গিত দেয়।

৫. চাকরি চলে গেলে নতুন চাকরি কখন পাওয়া যাবে?
সাধারণত অশুভ দশা শেষ হয়ে যখন কোনো শুভ ভাব যেমন—একাদশ (লাভ), নবম (ভাগ্য), দ্বিতীয় (ধন) বা দশম ভাবের দশা বা অন্তর্দশা শুরু হয়, তখন নতুন চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

৬. চন্দ্র লগ্ন থেকে বিচার করা কি জরুরি?
অবশ্যই। অনেক সময় জন্মলগ্নে যোগ স্পষ্ট না হলেও চন্দ্র লগ্ন থেকে দশম পতি ও দুঃস্থানের সম্পর্ক স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। তাই সঠিক ফলাফলের জন্য উভয় লগ্ন বিচার করা প্রয়োজন।